ওষুধ ও অসুস্থতার কারণে মাসিকে পরিবর্তন: কেন মাসিক পিছিয়ে যায় বা অনিয়মিত হয় তার চিকিৎসা গাইড
জ্বর বা ওষুধের কারণে মাসিক কি পিছিয়ে গেছে? ডেঙ্গু, অ্যান্টিবায়োটিক, থাইরয়েড ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওষুধের প্রভাবে মাসিক পরিবর্তনের পূর্ণাঙ্গ গাইড পড়ুন।
অনেকেই লক্ষ্য করেন যে একটি তীব্র জ্বর বা অ্যান্টিবায়োটিক কোর্স শেষ করার পর সে মাসে পিরিয়ড নির্ধারিত সময়ে না হয়ে অনেক দেরিতে হচ্ছে, অথবা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রক্তপাত হচ্ছে। এতে অনেকেই প্রেগন্যান্সি বা বড় কোনো জরায়ুর জটিলতা ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলে, ওষুধ ও অসুস্থতার কারণে এমন সাময়িক চক্র বিপর্যয় অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।
১. অসুস্থতা ও ওষুধের প্রভাবে হরমোন পরিবর্তনের ফিজিওলজি
২. অসুস্থতার প্রভাব: ডেঙ্গু, জ্বর ও ইনফেকশন
- ডেঙ্গু ও ভাইরাল ফিভার: আমাদের দেশে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হলে রক্তে প্লাটিলেট কমে যায় এবং শরীরে তীব্র প্রদাহ তৈরি হয়। এই সময়ে মাসিক শুরু হলে অতিরিক্ত রক্তপাত হতে পারে। অথবা জ্বর সারার পর পরবর্তী মাসিকটি ১০–১৫ দিন পিছিয়ে যেতে পারে।
- সার্জারি ও শারীরিক ট্রমা: অ্যানেস্থেশিয়া এবং অপারেশনের মানসিক চাপ প্রায়শই পরবর্তী ১-২টি সাইকেলকে অনিয়মিত করে ফেলে।
৩. যেসব ওষুধ নিয়মিত মাসিকে প্রভাব ফেলে
- রক্ত পাতলা করার ওষুধ (Anticoagulants / Aspirin / Heparin): হৃদরোগ বা রক্তনালীর ব্লকেজের জন্য ব্যবহৃত এই ওষুধগুলো রক্ত জমাট বাঁধতে দেয় না, ফলে মাসিকের সময় অতিরিক্ত রক্তপাত (Heavy Flow) হতে পারে।
- থাইরয়েড ওষুধ (Thyroxine / Carbimazole): থাইরয়েডের ডোজ যদি সঠিক না থাকে, তবে মাসিক খুব ঘন ঘন হতে পারে অথবা কয়েক মাস বন্ধ থাকতে পারে।
- মানসিক স্বাস্থ্যের ওষুধ (Antidepressants & Antipsychotics): কিছু বিশেষ ওষুধ মস্তিষ্কের ডোপামিন ব্লক করে প্রোল্যাকটিন হরমোন বাড়িয়ে দেয়। প্রোল্যাকটিন বাড়লে ডিম্বাশয় সাময়িকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে মাসিক বন্ধ থাকে।
- স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ (Prednisolone / Dexamethasone): অ্যালার্জি বা বাতের জন্য ব্যবহৃত উচ্চমাত্রার স্টেরয়েড হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত করে।
- জরুরি গর্ভনিরোধক পিল (Emergency Pill / i-pill / Norix): অনেকেই নিয়মিত জন্মনিয়ন্ত্রণের উপায় হিসেবে ঘন ঘন ই-পিল সেবন করেন। এতে থাকা উচ্চমাত্রার প্রোজেস্টিন হরমোন পরবর্তী দুই-তিন মাসের মাসিক চক্রকে পুরোপুরি উলটপালট করে দেয়।
৪. ওষুধের ক্যাটাগরি ও মাসিকের পরিবর্তনের সারসংক্ষেপ
| ওষুধের ধরন / অসুস্থতা | মাসিকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব | করণীয় ও চিকিৎসকের পরামর্শ |
|---|---|---|
| তীব্র জ্বর / ডেঙ্গু / কোভিড | ওভিউলেশন পিছিয়ে মাসিক ১-২ সপ্তাহ দেরি | পর্যাপ্ত বিশ্রাম, পানি ও পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ |
| রক্ত পাতলা করার ওষুধ | অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ও বড় জমাট রক্ত | রক্তশূন্যতা এড়াতে গাইনোকোলজিস্টকে জানানো |
| অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ | পিরিয়ড বন্ধ হওয়া বা স্তন দিয়ে তরল ক্ষরণ | সাইকিয়াট্রিস্টের সাথে কথা বলে ডোজ রি-অ্যাডজাস্ট |
| জরুরি পিল (E-Pill) | অনিয়মিত রক্তপাত ও চক্রের তারিখ পরিবর্তন | নিয়মিত ব্যারিয়ার মেথড (কনডম) ব্যবহার করা |
| কেমোথেরাপি | স্থায়ী বা সাময়িক ডিম্বাশয়ের নিষ্ক্রিয়তা | প্রজনন সংরক্ষণ (Fertility Preservation) কাউন্সেলিং |
৫. কখন ডাক্তার দেখাবেন?
- অসুখ সেরে যাওয়ার পর যদি টানা ৩ মাসের বেশি মাসিক স্বাভাবিক ছন্দে না ফেরে।
- রক্ত পাতলা করার ওষুধ চলাকালীন প্রতি ঘণ্টায় ১টির বেশি প্যাড সম্পূর্ণ ভিজে যায়।
- নতুন কোনো ওষুধ শুরু করার পর মাসিকে চরম পরিবর্তন এলে নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ না করে প্রেসক্রাইব করা ডাক্তারকে অবহিত করুন।
“🩺 চিকিৎসকের পরামর্শ (Medical Disclaimer): কোনো অবস্থাতেই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিয়মিত সেবন করা প্রেসক্রিপশনের ওষুধ (যেমন থাইরয়েড, হার্ট বা প্রেশারের ওষুধ) নিজে নিজে বন্ধ করবেন না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে অসুস্থতা কেটে গেলে ১-২ মাসের মধ্যেই শরীর স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার স্বাভাবিক মাসিক চক্রে ফিরে আসে।

Dr. Tasnim Ara
OB-GYN & Women's Health Specialist
Dedicated to creating evidence-based, compassionate health resources for women through every stage of life.
চিকিৎসাগতভাবে পরীক্ষিত। এই গল্পটি ফিমিভিয়ার চিকিৎসা বোর্ড দ্বারা বর্তমান চিকিৎসা নির্দেশিকা অনুযায়ী পরীক্ষিত। এটি শিক্ষামূলক — স্বাস্থ্যগত বিষয়ে সর্বদা আপনার চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।



আলোচনার জায়গা০
একটি মমতাময়, নিয়ন্ত্রিত স্থান। এই গল্পটি আপনাকে কীভাবে স্পর্শ করেছে, তা শেয়ার করুন।
আলোচনায় যোগ দিতে প্রবেশ করুন